,

অভাবের তাড়নায় সন্তান বিক্রি করলেন পিতা!

দুলাল মিয়া ও তার পরিবারের সদস্যরা

ময়মনসিংহ প্রতিনিধি: ফুলবাড়িয়া উপজেলার জোরবাড়িয়া গ্রামে ঘর নির্মাণ করে দেওয়ার বিনিময়ে ৪ দিন বয়সের পুত্র সন্তানকে বিক্রি করে দিয়েছে হতদরিদ্র পিতা দুলাল মিয়া। অভাবের তাড়নায় পিতা নবজাতক বিক্রি করলেও মা রওশন আরার কান্না কোনোভাবেই থামছে না।

মা রওশন আরা বলেন, ২০ হাজার টাকা ও একটি নতুন ঘর নির্মাণ করে দেওয়ার কথা বলে আমার ৪ দিনের পুত্র সন্তানকে ঢাকার এক চাকুরিজীবীর কাছে দিয়ে দিয়েছেন। স্থানীয় আব্দুর রউফের সাথে যোগাযোগ করে সন্তান খোঁজখবর জানতে হয়। সরাসরি যোগাযোগ করতে পারি না। তার কাছে শুনছি আমার ছেলে নাকি ভালো আছে, হাসপতালে চিকিৎসা চলছে। আমার ছোট পুত্র সন্তানের জন্য বুকটা ফেটে যাচ্ছে বলতেই কান্নায় ভেঙে পড়েন মা রওশন আরা।

জানা গেছে, জোরবাড়িয়া গ্রামের মৃত খোরশেদ আলীর শারীরিক প্রতিবন্ধী পুত্র দুলাল মিয়ার (৪৫) প্রথম স্ত্রী নাজমা খাতুন দুই সন্তান রেখে প্রায় ১৫ বছর পূর্বে মারা যায়। প্রথম স্ত্রীর মৃত্যুর ৫ বছর পর পাশ্ববর্তী জোরবাড়িয়া কোনাপাড়া গ্রামের আ. মান্নানের মেয়ে রওশনা আরাকে দ্বিতীয় বিয়ে করেন। প্রায় ১০ বছরের সংসারে দ্বিতীয় স্ত্রীর ঘরে জন্ম নেয় শান্তা, সিয়াম, সানজিদা, সিফাদ। সবার বয়স দেড় বছর থেকে ৮ বছর।

গত ২৫ দিন পূর্বে রওশন আরা আরো একটি পুত্র সন্তান জন্ম দেয়। হতদরিদ্র পিতা সন্তান লালন-পালন করতে পারবে না বলে বন বিভাগে চাকুরি করেন তার কাছে ২০ হাজার টাকা ও নতুন ঘর নির্মাণ করে দেওয়ার বিনিময়ে স্থানীয় আব্দুর রউফের মাধ্যমে চার দিন বয়সের নবাজাতককে বিক্রি করে দেয়।

বৃহস্পতিবার সরেজমিনে দেখা গেছে, জোরবাড়িয়া মধ্যপাড়া গ্রামে শারীরিক প্রতিবন্ধী দুলাল মিয়ার ছোট একটি ভাঙ্গা খুপড়ি ঘর। জমিজমা নেই। মাঝে মধ্যে ভিক্ষাবৃত্তি করেন। স্ত্রীসহ ৪ সন্তান নিয়ে অর্ধাহারে অনাহারে দিনাতিপাত করেন। খুপড়ি ঘরটিও ভাইয়ের দেওয়া এক শতাংশ জমির ওপর। সন্তানরা কেউ স্কুলে যায় না। অভাব অনটনের সংসার তার।

দুলালের মা সুরজান বেগম (৭০) বলেন, ঘর করার টাকা দেওয়ার বিনিময়ে আমার নাতিকে নিয়েছে, এখন ঘর করে দিচ্ছে না। টাকা পয়সা তাদের (রউফ) কে দিছে কিনা আমারা জানি না।

পিতা দুলাল মিয়া প্রথমে সন্তান বিক্রির কথা অস্বীকার করলেও পরবর্তীতে তিনি স্বীকার করে বলেন, থাকার মতো কোনো ঘর নেই, সন্তানদের ঠিকমতো খাবার দিতে পারি না। তাই নতুন একটি ঘর নির্মাণের করে দেওয়ার বিনিময়ে আব্দুর রউফের মাধ্যমে ৪ দিন বয়সের পুত্র সন্তানকে ঢাকায় একজন চাকুরিজীবীকে দিয়ে দিয়েছি। এখন ঘর করে দিচ্ছে না। যে আমাদের সন্তান নিয়েছে তাকে আমার চিনি না। আমাদের ছবি, ভোটার আইডি কার্ড নিতে চাইছে ও স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর করতে বলেন, আমরা করিনি।

আব্দুর রউফ বলেন, দুলালের স্ত্রীর সন্তান হওয়ার আগে থেকে তারা তাদের সন্তানকে কোথাও পালক (দত্তক) দিয়ে দিতে বলেন। আমার ছেলে মাধ্যমে তাদের সন্তানকে দত্তকের ব্যবস্থা করি। পুত্র সন্তান হওয়ার পর তারা ছেলের বিনিময়ে প্রথমে এক লাখ টাকা পরবর্তী ৫০ হাজার টাকা দাবি করেন। পরে একটি নতুন ঘর নির্মাণ করে দেওয়ার বিনিময়ে তাদের সন্তান দত্তক দিয়ে দেই। সন্তান যদি তারা ফিরিয়ে নিতে চায়, তাহলে নিয়ে এসে তাদেরকে বুঝিয়ে দিব।

কার কাছে সন্তান দত্তক দিয়েছেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমি তাদের চিনি না আমার ছেলের পরিচিত।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা লীরা তরফদার বলেন, নিজের সন্তান বিক্রি করা সমাজের জঘন্যতম কাজ। তাদের যদি ঘরের সমস্যা হয়ে থাকে তাহলে আমাকে জানালে অবশ্যই একটা ব্যবস্থা করে দিতাম। সন্তান বিক্রির বিষয়টি খোঁজ খবর নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এই বিভাগের আরও খবর